সংখ্যালঘু নির্যাতনের কোনো বিচার আজ পর্যন্ত হয়নি

বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের কোনো বিচার আজ পর্যন্ত হয়নি। মামলা করার সিদ্ধান্ত নিলেও মামলা দায়ের হয় না। ঘটনার পরপর তাত্ক্ষণিকভাবে মামলার এফআইআর হলেও ওই মামলাও বেশি দূর এগোয়নি। কিন্তু সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনার পরপরই সারাদেশে জনমত সৃষ্টি হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশিত হলেও ওই রিপোর্ট অনুযায়ী কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না। এর ফলে সংখ্যালঘু নির্যাতনকারীরা নির্যাতন করেও পার পেয়ে যাচ্ছে। দেশের সংখ্যালঘুদের এই বাস্তবতার প্রেক্ষাপটেই বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে সংখ্যালঘু নির্যাতনকারীদের বিচারের দাবি জানিয়েছে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ।

চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরদিন দিনাজপুর, যশোর, সাতক্ষীরা, গাইবান্ধা ও ঠাকুরগাঁওয়ে সংখ্যালঘু ধর্মাবলম্বীদের বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। নির্বাচনে ভোট দেয়ার কারণে দিনাজপুরের সদর উপজেলার চেহেলগাজী ইউনিয়নের কর্ণাই গ্রাম ও যশোরের অভয়নগরের মালোপাড়ায় হিন্দুদের শতাধিক বাড়িঘর ও দোকানপাটে অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও লুটপাট হয়েছে। যশোর জেলার মনিরামপুর ঋষি পাড়ায় হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ওপর নির্যাতন হয়েছে। অন্যদিকে ভোট না দেয়ার জন্য যশোর-২ আসনের ঝিকরগাছা উপজেলার শ্রীরামপুর গ্রামের অন্তত ১০ জনকে মারধর করা হয়েছে। এর আগে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় ঘোষণার পর সাতক্ষীরাসহ দেশের কয়েকটি জেলায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে।

২০০১ সালে নির্বাচনের পর সংখ্যালঘু নির্যাতনের চিত্র আরও ভয়াবহ। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তৈরি করা এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০০১-এর সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবর এ দুমাসে ঢাকা বিভাগে ১১২টি, রাজশাহী বিভাগে ৫৯টি, খুলনা বিভাগে ৯৭টি, বরিশাল বিভাগে ৬১টি, সিলেট বিভাগে ৪টি, চট্টগ্রাম বিভাগে ৩৯১টি গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায় আক্রান্ত ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। নির্যাতনমূলক ঘটনার সংখ্যা ৩৩২টি। খুন হয়েছে ৩৪ জন। ধর্ষিতা নারীর সংখ্যা ১২২ জন। আহত ১৪০২ জন। হয়রানিমূলক ঘটনা ঘটেছে ১২৮টি ও অন্যান্য অপরাধ ৩২টি। ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি ধ্বংসের ঘটনা ১৩৭৭টি। দেশ ত্যাগ করেছে বরিশালে ১৬ হাজার, চট্টগ্রামে ১০ হাজার, ভোলায় ২ হাজার ২০০, বাগেরহাটে ১০ হাজার, ফরিদপুরে ৫ হাজার এবং নোয়াখালীতে দেড় হাজার। ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের সংখ্যা সবচাইতে বেশি ঘটেছে ভোলায় (৬৫), তারপরই রয়েছে বরিশাল (৩৩), যশোর (২০), লক্ষ্মীপুর (২৬)। শারীরিক নির্যাতনের সংখ্যাও বেশি বরিশালে (৩১৮)। এরপর লক্ষ্মীপুর (২৮০), কুমিল্লায় (২৭৪), এবং ভোলায় (২১৪)। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি)’র দায়ের করা রিট আবেদনের পরিপ্র্রেক্ষিতে ২০০১ সালের ঘটনায় ২০০৯ সালে সরকার একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে। হাইকোর্টের নির্দেশে ওই বছরের ২৭ ডিসেম্বর সরকার সাবেক জেলা ও দায়রা জজ মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের নেতৃত্বে তিন সদস্যের এ তদন্ত কমিশন গঠন করে। দীর্ঘ দুই বছর তদন্ত করে ২০১১ সালের ২৬ এপ্রিল সরকারের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন কমিশন। ওই প্রতিবেদনে তদন্ত কমিশন অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপি ও জামায়াতের সংঘটিত সুনির্দিষ্ট ৪ হাজারের মতো অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়। এসবের সঙ্গে জড়িত অভিযুক্ত ব্যক্তির সংখ্যা ২০ হাজারেরও বেশি। একইসঙ্গে হাইকোর্ট বিভাগের দেয়া নির্দেশনা অনুযায়ী সরকারের গঠিত তদন্ত কমিশন নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় জড়িতদের বিচারে আওতায় আনার সুপারিশ করেন। এই সুপারিশের ভিত্তিতে ২০০১ সালের নির্বাচনপরবর্তী সংখ্যালঘুদের নির্যাতনের দায়ে ১৮টি জেলায় মামলা করার সিদ্ধান্ত নেয় গত মহাজোট সরকার। কিন্তু পুলিশি তদন্তের গাফিলতির কারণে একটি ছাড়া কোনো মামলাই করতে পারিনি ওই সরকার।

ওই মামলাটি হলো, ২০০১ সালে নির্বাচনপরবর্তী সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনায় পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ থানায় দায়েরকৃত মামলা। ২০১৩ সালে ১৮ জুলাই সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরীসহ ২১ জনের বিরুদ্ধে পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ আনা হয়। ওই মামলারও কোনো অগ্রগতি নেই।

এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ১৯৭১ সালে এ দেশে হিন্দু জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ছিল দুই কোটি ১০ লাখ, আর ২০১৩ সালে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে এক কোটি ৫৫ লাখে। স্বাধীনতার ৪৩ বছরে দেশের জনসংখ্যা দ্বিগুণ ছাড়ালেও এ দেশে হিন্দু জনসংখ্যা কমে গেছে প্রায় ২০ শতাংশ। ১৯৫১ সালে এ অঞ্চলে মোট জনসংখ্যার ২২ শতাংশ ছিল হিন্দু, ২০০১ সালে ৯.২ শতাংশ আর ২০১১ সালে এ সংখ্যা কমে হয়েছে ৮.৫ শতাংশ (আদমশুমারি রিপোর্ট)।

৫ জানুয়ারি নির্বাচনপরবর্তী সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংস হামলার ঘটনার আশঙ্কার কথা পুলিশ প্রশাসনকে জানালেও পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। অভিযোগ আছে, ঘটনা ঘটার পরও পুলিশ দ্রুত কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। ত্বরিত ব্যবস্থা নিলে ঘটনা এতটা ভয়বহ হতো না। হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদও এই অভিযোগ করেছে। এবার এসব ঘটনার তদন্তের সময় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত বর্তমানকে বলেন, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে যেন দায়মুক্তির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। এই অপসংস্কৃতি অনতিবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। সরকার যদি আন্তরিক হয়, এই আন্তরিকতা দেখাতে হবে সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে। দ্রুত বিচার আইন ও সন্ত্রাস দমন আইনে এসব ঘটনার বিচার ট্রাইব্যুনালে করতে হবে। তিনি সংখ্যালঘুবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও সংখ্যালঘুবিষয়ক কমিশন গঠনের দাবি জানিয়ে বলেন, এই বিচার তদারকি ও সংখ্যালঘুদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য সংখ্যালঘুবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও সংখ্যালঘুবিষয়ক কমিশন গঠন করা জরুরি। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, সংখ্যালঘুদের রক্ষায় প্রশাসন ব্যর্থ হয়েছে। যাতে কোনো সংখ্যালঘু পরিবার হামলা বা নির্যাতনের শিকার না হয়, সেজন্য তাদের নিরাপত্তা এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। তিনি বলেন, সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিচারের যে উদ্যোগ নিয়েছে তা হতে হবে স্বচ্ছ এবং নিরপেক্ষ। নির্যাতনের ঘটনা তদন্তে পুলিশ বা তদন্ত সংস্থাকে নিরপেক্ষতা এবং দক্ষতার সঙ্গে তদন্ত করতে হবে। প্রকৃত অপরাধীকে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। মনে রাখতে হবে যে, অপরাধী কোনো দলের হতে পারে না। অপরাধীর কোনো দলীয় পরিচয় থাকতে পারে না।

এ সম্পর্কে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বর্তমানকে বলেন, সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনাগুলো যেমন রাজনৈতিক, তেমনি বিচার যে হয়নি এটিও রাজনৈতিক। এটা যেন এমন যে, এই সংস্কৃতিকে আমাদের রাজনীতিবিদরা জিয়ে রাখতে চান। তিনি বলেন, আমি বুঝি না এসব ঘটনার মামলা বা বিচার কেন হয় না। এসব তো ক্রিমিনাল কেস। ক্রিমিনাল মামলার তদন্ত করা সবচেয়ে সহজ বিষয়। এসব ঘটনা যারা ঘটায় তারা ভিকটিমদের খুব কাছেই থাকার কথা। তাহলে তদন্তে কেন প্রমাণ আসে না! তদন্ত করে প্রমাণ পায় না, এটা আমি বিশ্বাস করি না। হতে পারে আমাদের রাষ্ট্র এ ঘটনাগুলোতে সচেতনভাবে এড়িয়ে যায়। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিচালক নূর খান বলেন, সংখ্যালঘু নির্যাতনের ন্যায়বিচারের জন্য প্রয়োজন, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ এবং দলীয় প্রভাবমুক্ত তদন্ত। তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী পুলিশই এসব ঘটনার তদন্ত করবে। তাই পুলিশকে আগে এ বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে হবে। আর সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। নয় তো ভয়ে অনেকেই সাক্ষী দিতে চাইবে না। তিনি বলেন, সুষ্ঠু তদন্ত না হলে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে না।

আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে সংখ্যালঘুদের জন্য সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও কল্যাণবিষয়ক মন্ত্রণালয় রয়েছে। একাধিকবার রাষ্ট্রপতি-উপরাষ্ট্রপতিসহ সরকারের অতি গুরুত্বপূর্ণ পদেও সংখ্যালঘুরা আসীন হয়েছেন। এমনকি মূলধারার রাজনৈতিক ক্ষমতার অংশীদার হয়েছেন এমন নেতার সংখ্যাও সেদেশে কোনো অংশে কম নয়। ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও তফসিলি সম্প্রদায়ের লোকজন প্রশাসন এবং সামরিক বিভাগেও উচ্চপদে আসীন হয়েছেন। শুধু ভারতেই নয়, পাকিস্তানের মতো একটি অস্থিতিশীল দেশেও প্রধান বিচারপতি পদে সংখ্যালঘুরা যেতে পারেন এবং সে দেশের জাতীয় পরিষদের সংরক্ষিত ৭০টি আসনের মধ্যে ১০টি ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের জন্য সংরক্ষণ করা আছে। ভারত ও পাকিস্তানের ন্যায় বাংলাদেশে এটা চালু করা যায় কি না তা ভেবে দেখা দরকার। যদিও বাংলাদেশে প্রতি নির্বাচনেই দুই প্রধান দলের নির্বাচনী ইশতেহারেই থাকে ধর্মীয় সংখ্যালঘুর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের চির অবসানের প্রত্যয়। কিন্তু নির্বাচিত হওয়ার পর কোনো দলেরই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে এর কোনো প্রতিফলনই দেখা যায় না।

উৎসঃ   বর্তমান

Advertisements
This entry was posted in in Bangla, News and tagged , . Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s