কিছু স্থানে আ’লীগ- বিএনপি-জামায়াত মিলে হিন্দুদের নির্যাতন করেছে: সুলতানা কামাল

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা  ও আইন সালিশ কেন্দ্রের (আসক) নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেছেন, বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি যথার্থই মুখ থুবড়ে পড়েছে। তবে বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে একতরফাভাবে সরকারের ওপর দোষ চাপানো ঠিক নয়। তাছাড়া দেশে অনেকাংশে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ঘটছে একথাও ঠিক। তবে সেখানেও শুধুমাত্র সরকারপক্ষের কারণেই এসব হত্যাকাণ্ড ঘটছে  এমনটি নয়। রেডিও তেহরানের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তিনি এসব কথা বলেন।তিনি আরো বলেছেন,  সাম্প্রতিক নির্বাচন নিয়ে  আমরা নানা প্রশ্ন ও অস্বস্তির মধ্যে রয়েছি। তবে নির্বাচনের পর খানিকটা স্বস্তি ফিরে এসেছে।

প্রশ্ন: নিউ ইয়র্কভিত্তিক খ্যাতনামা মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের প্রতিবেদনে বলেছে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি মুখ থুবড়ে পড়েছে। সরকার ক্রমেই অসহিষ্ণু ও স্বৈরাচারী হয়ে উঠছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এই প্রতিবেদনকে আপনার কাছে কতখানি বাস্তবসম্মত মনে হয়? নাকি এর মধ্যে অতিরঞ্জিত বা একপেশে বিষয় রয়েছে?
সুলতানা কামাল: হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে যে প্রতিবেদন করেছেন আমি তাদের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। তারা অত্যন্ত ক্রেডিবেল হিউম্যান রাইটস সংগঠন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে হিউম্যান রাইটস নিয়ে তাদের কর্মকাণ্ড প্রশংসার দাবি রাখে, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। তবে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে ওরা কাদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করছে সে বিষয়টিও কিন্তু বিবেচনার দাবি রাখে। বাংলাদেশে মানবাধিকার ‘মুখ থুবড়ে’ পড়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এ বক্তব্য হচ্ছে ‘স্টেটম্যান অব ফ্যাক্ট’; এটি সত্য কথা। কিন্তু সেখানে একতরফাভাবে সরকারের ওপর যে দোষ চাপানো হয়েছে সেটা ঠিক নয়। সরকারের ব্যাপারে আমাদের বক্তব্য হচ্ছে- সব কিছুর একটা প্রোপোশানালিটি আছে। বাংলাদেশে মানবাধিকার প্রসঙ্গে যে ধরনের ঘটনাগুলো ঘটছে সেটার পরিপ্রেক্ষিতে আইনসঙ্গত ও সাংবিধানিকভাবে এবং মানবাধিকারের আঙ্গিকে সব জায়গায় সরকার সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারছে কি না সে বিষয়ে প্রশ্ন করা যায়। আর বাংলাদেশে মানবাধিকার নিয়ে সবচেয়ে বড় সংকট হচ্ছে- মানবাধিকারের বিষয়ে সবার মধ্যে ঐক্যমত্য নেই। একথা সত্য যে দেশের মানুষের জীবনে নানাধরনের বিপর্যয় চলছে। মানুষ নানাভাবে অনিরাপত্তার মধ্যে রয়েছে।

প্রশ্ন: এদিকে দেশে খুন, খারাবি, গুম হত্যা নিয়ে মিডিয়াতে নানা রিপোর্ট ছাপা হয়েছে। সেখানে বলা হচ্ছে, গত ২১ দিনে ৫৭ জন নিহত হয়েছে। এর বেশিরভাগই রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। তবে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, কোনো রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের তথ্য তার জানা নেই। একজন মানবাধিকার কর্মী হিসেবে বাংলাদেশের বাস্তবতাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
সুলতানা কামাল: হ্যাঁ অনেকাংশে এগুলো রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। কিন্তু এমন নয় যে শুধুমাত্র সরকারপক্ষের কোনো আচরণের কারণেই এসব হত্যাকাণ্ড ঘটছে। আপনারা নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন যে বিভিন্নভাবে দুষ্কৃতিকারীরা মানুষের ওপর নানাধরনের হামলা চালাচ্ছে। সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা চলছে। সাধারণ মানুষের ওপর হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছে। তাছাড়া গানপাউডার দিয়ে গাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে। মানুষের অপ্রস্তুত ও অরক্ষিত অবস্থায় তাদের ঘরে ঢুকে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্ব মানুষের সুরক্ষা দেয়ার। কিন্তু সরকার তাদেরকে সুরক্ষা দিতে পারছে না। এখানে সামগ্রিকভাবে বলা যেতে পারে দেশে একটি রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা চলছে। আর সেটার সুযোগে নৈরাজ্য সৃষ্টিকারীরা নানাভাবে নানাধরনের মানবাধিকারের লঙ্ঘন ঘটাচ্ছে।

প্রশ্ন: দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে।  এ হামলার জন্য বেশিরভাগ অভিযোগ রয়েছে জামায়াত-শিবিরের বিরুদ্ধে। আবার বিএনপি নেতারা বলছেন, সরকারি দলের লোকেরা সংখ্যালঘুদের নির্যাতন করছে। প্রশ্ন হচ্ছে, আসলে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও নির্যাতন কারা করেছে বা করছে?
সুলতানা কামাল: সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের ঘটনা মূলত জামায়াত-শিবিরের অনুসারীরা ঘটাচ্ছে। এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে যখন জামায়াত নেতা কাদের মোল্লার বিচারের রায় হলো তখন থেকেই এটা শুরু হয়েছে। এরপর মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার রায়ের পর তা প্রকট আকার ধারণ করল। তারপর থেকে অব্যাহতভাবে হিন্দুদের ওপর হামলা হচ্ছে। তবে এই সুযোগে অন্য কেউ যে এই ধরনের কাজ করছে না সে কথাও পরিষ্কারভাবে বলা সম্ভব না। কারণ কিছু কিছু জায়গায় আমরা অভিযোগ পেয়েছি যে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াত ও শিবির সবাই মিলে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর হামলা চালিয়েছে। কারণ এটার পেছনে রয়েছে ভূমিদস্যুতা। হিন্দুদের যতটুকু সহায়-সম্বল রয়েছে তা গ্রাস করে নিজেদের দখলে নিয়ে যাওয়াও একটি অন্যতম কারণ। কোন্ পটভূমিকায় হিন্দুরের ওপর হামলা হচ্ছে সে বিষয়টিও আমাদেরও মনে রাখতে হবে। ১৯৭৫ পরবর্তী সময় থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশে রাষ্ট্রের সমর্থনে ও পৃষ্টপোষকতায় ইসলামীকরণ প্রক্রিয়া চলে আসছে। এটা শুরু করেছিলেন দুই জেনারেল। পরবর্তীতে গণতান্ত্রিকভাবে যারা ক্ষমতায় এসেছেন তারাও এর হাত থেকে নিস্তার পাননি কিম্বা নিস্তার নিতে চাননি। প্রতিটি সরকার কিম্বা প্রতিটি রাজনৈতিক দল পরস্পরের বিরুদ্ধে অন্য দলকে খেলাতে চেয়েছে। আর সেকারণে কেউই স্পষ্টভাবে এসব অন্যায়ের ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

আমি এ ব্যাপারে একটা উদাহরণ তুলে ধরতে চাই। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর যে সহিংসতা হয়েছিল; যা সমস্ত পৃথিবীর বিবেককে নাড়া দিয়েছিল। তার বিচার ১৩ বছর পরও হয়নি। এ ব্যাপারে কোর্ট একটি রায়ে ২০০১ সালের সেই ঘটনার প্রতিবেদন কেন আদালতে উপস্থাপন করা হয়নি সে ব্যাপারে কারণ দর্শানোর কথা বলেছে। একইসাথে আগামী সপ্তার মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছে। তো কেন সেই ঘটনার বিচার করতে ১৪ বছর সময় লাগল?  কারণ ৯০’ পরবর্তী সময়ে যেসব সরকার ক্ষমতায় এসেছে তারা সবাই আপসকামিতার মধ্যে দিয়ে সরকার পরিচালনা করেছে। তারা কখনই সাহস করে মৌলবাদ, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে স্পষ্ট কোনো অবস্থান নেয়নি। যারা ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করে তাদের ব্যাপারেও কোনো অবস্থান নেয়নি। আসলে এ ব্যাপারে একটা ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। ফলে এই প্রবণতা এমন একটা জায়গায় চলে গেছে যে যথার্থই আজকে মানবাধিকার মুখ থুবড়ে পড়েছে। তবে সেখানে এককভাবে কেউ দায়ী না। এখানে নানাভাবে ঐতিহাসিক,সামাজিক,অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রক্রিয়া কাজ করেছে। শুধু তাই নয় এটা আমাদের সংস্কৃতিতেও ঢুকে গেছে।

প্রশ্ন: এবার রাজনৈতিক পরিস্থিতির দিকে দৃষ্টি দিতে চাই। যে নির্বাচনের মাধ্যমে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসেছে তার গ্রহণযোগ্যতা ও বৈধতা নিয়ে নানা আলোচনা ও সমালোচনা দেশের ভেতরে এবং বাইরে এখনও হচ্ছে। এ ব্যাপারে সংসদের বাইরের প্রধান বিরোধী দলের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু  বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল  আহমেদ বলেছেন, বিএনপির সঙ্গে কোনো সংলাপ হবে না এবং পরবর্তী নির্বাচন হবে পাঁচ বছর পর। বাণিজ্যমন্ত্রীর এ বক্তব্যে কি সংলাপের সম্ভাবনা কমে গেল না?
সুলতানা কামাল: দেশে একটি নির্বাচন হয়েছে এবং নির্বাচন সম্পর্কে আমরা প্রত্যেকেই  নানাভাবে প্রশ্ন করছি এবং অনেকরকম অস্বস্তির মধ্যে রয়েছি। তবে এটাও ঠিক যে নির্বাচনটা হয়ে যাওয়ার পর আপাতত একটা স্বস্তি ফিরে এসেছে। আর আমি মনে করি আমাদের মধ্যে সম্ভবত একটা রাজনৈতিক দৈন্যতা রয়েছে। কারণ আমরা সব সময়  উভয় পক্ষ বলে থাকি। আমার মনে হয় প্রতিটি রাজনৈতিক দল একসঙ্গে বসে চিন্তাভাবনা করে এমন একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি করবেন যাতে রাজনীতিবিদদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে না পারে। কারণ রাজনীতিবিদদের নিয়ে প্রশ্ন উঠলে প্রতিষ্ঠানগুলো ভীষণভোবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জনমনে নানা প্রশ্ন উঠতে থাকে তাদের সম্পর্কে। আর তখন একটা অনিরাপত্তাবোধ, শঙ্কা ও  অস্বস্থি দেখা দেয়। আর সেটা জাতির জন্যে মোটেই কাংখিত নয়। আপনি তোফায়েল আহমেদের নাম উল্লেখ করেছেন। তবে আমার মনে হয় যে এসব ব্যাপারে কথা বলার জন্য সরকার পক্ষ কিম্বা প্রতিটি দলের বিশেষ কোনো মুখপাত্র থাকা উচিত। তারা যদি দলের হয়ে দলের অবস্থানের কথা মানুষের কাছে তুলে ধরেন তাহলে আমার মনে হয় যে ভালো একটা অবস্থা তৈরি হতে পারে। আর তা নাহলে এধরনের কথায় মানুষ বারবার বিভ্রান্ত হতে থাকে।

প্রশ্ন: আমরা লক্ষ্য করছি, সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতরা বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করছেন। বৃটিশ হাইকমিশনার রবার্ট গিবসন যোগাযোগমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বলেছেন, দ্রুত সংলাপে বসতে হবে। তো সংলাপ ও নির্বাচনের ব্যাপারে বিদেশিদের চাপকে কীভাবে দেখছেন? এটিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশি হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখার সুযোগ আছে কি না?
সুলতানা কামাল: দেখুন এই ব্যাপারে আমি খুব একটা স্বস্তিবোধ করি না।  কারণ হচ্ছে বিষয়টা সম্পূর্ণভাবে বাংলাদেশের জনগণের সিদ্ধান্তের ব্যাপার। আমি মনে করি বাংলাদেশের জনগণের মৌলিক দায়িত্ব হচ্ছে এ ব্যাপারে একটা সুনির্দিষ্ট অবস্থান নেয়া। অনেকক্ষেত্রে এমন হয় যে এদেশের জনগণ হয়তো কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না সেক্ষেত্রে তাদের সিদ্ধান্তগুলো নিতে হবে। আর এক্ষেত্রে আমাদের ভেতরের মানুষদের কারো কারো ভূমিকা থাকতে পারে। তবে আমি মনে করি এটা সম্পূর্ণভাবে জনগণের ওপরেই ছেড়ে দেয়া উচিত। বাংলাদেশের জনগণ নিজেদের জন্য সিদ্ধান্ত নিতে যথেষ্ট সক্ষম। তারা অবশ্যই নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরাই নিতে পারে। তবে এটাও ঠিক বর্তমানে আমরা একটা আন্তর্জাতিক বলয়ের মধ্যে বাস করি। ফলে আন্তর্জাতিক অনেক কিছুই সবাইকে মেনে চলতে হয়। তারপরও প্রতিটি দেশের কিছু কিছু বিষয় থাকে যেখানে সিদ্ধান্ত নেয়ার মূল দায়িত্ব জনগণের ওপর ছেড়ে দেয়া উচিত। যদি আমাদের কোনো সহযোগিতার প্রয়োজন হয় তখন অন্য কেউ সহযোগিতার হাত বাড়াবেন। সেখানে বন্ধুত্বের একটা ব্যাপার থেকেই যায়। তবে সে ধরনের আবেদন যদি জনগণের কাছ থেকে যায় তখনই অন্যের সহযোগিতার জন্য হাত বাড়ানো ভালো। বাইরের শক্তি নিজেদের উদ্যোগে আমাদের সহযোগিতা করার জন্য এগিয়ে আসবে এমনটি ভালো নয় বলে আমি মনে করি।

সূত্র: নতুন বার্তা

Advertisements
This entry was posted in in Bangla and tagged , , , . Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s