শাঁখারীবাজারে স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতার মন্দির দখল

হেরিটেজ হিসেবে সংরক্ষণের সরকারি নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ভয় দেখিয়ে পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজারে একটি সম্পত্তিসহ মন্দির দখলের অভিযোগ উঠেছে সরকার সমর্থক সংগঠন স্বেচ্ছাসেবক লীগের স্থানীয় এক নেতার বিরুদ্ধে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, দলীয় প্রভাব ও ভয় দেখিয়ে ইতিমধ্যে ওই ভবনটির ভাড়াটেদের উচ্ছেদ করেছেন ঢাকা মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগ (দক্ষিণ) এর সভাপতি দেবাশীষ বিশ্বাস। শাঁখারি বাজার এলাকার ১৪ নম্বর ভবনটির ২য় তলায় ‘শ্রী শ্রী কালা চাঁদ দেবের’ একটি মন্দির রয়েছে। ভবনের অন্যান্য অংশে বাস করছেন অন্তত ১০টি পরিবার। শাঁখারি বাজারের ১৪২টি সংরক্ষিত (হেরিটেজ) ভবনের মধ্যে রয়েছে ১৪ নম্বর ভবনটিও, যেগুলো ইতিমধ্যে সরকারি গেজেটভুক্ত হয়েছে। মন্দিরের পুরোহিত বিজয় ভট্টাচার্য বলেন, এই মন্দিরটি দেবোত্তর সম্পত্তি। আমরা কয়েক পুরুষ ধরে এই মন্দিরে পূজা দিয়ে আসছি। আমার বাবা পুরোহিত ছিলেন, এরপর আমার দাদা (ভাই) আর এখন আমি পূজা দেই। দেবাশীষ দা বেশ কয়েকদিন ধরে আমাকে নক করছেন। পরে আমাকে না পেয়ে আমার বড় ভাইকে গত সোমবার ডেকে নিয়ে যান। তাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে বাড়ি ছাড়তে বলে এবং তার হাতে ৩ লাখ টাকা দেয়া হয়। বিজয় বলেন, তিনি (দেবাশীষ) এলাকায় অনেক প্রভাবশালী, তার সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। যে পরিবারগুলো এতদিন ভবনটিতে থেকে আসছিলেন তাদের সবাইকে ভয় দেখিয়ে উচ্ছেদ করা হয়েছে বলে জানান বিজয়। এখন আমাদের পরিবার সহ ৩টি পরিবার এ ভবনটিতে থাকছে। কিন্তু আমরাও কতদিন থাকতে পারব তা জানি না।
শাঁখারি বাজারকে প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য ২০০৯ সালে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের ২০ কোটি টাকায় একটি প্রকল্প চালু হয়। এর আওতায় শাঁখারি বাজারের ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর সংস্কার এবং পয়ঃনিষ্কাশনসহ আধুনিক সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করার কথা ছিল। কিন্তু তা আর হয়নি। শাঁখারি বাজার এলাকার আরও কয়েকজনের সঙ্গে কথা বললে তারাও অভিযোগ করেন দেবাশীষের বিরুদ্ধে। তবে এদের কেউই ভয়ে নাম প্রকাশ করে কিছু বলতে চাননি। এলাকার এক প্রবীণ বলেন, আমি যতটুকু জানি এটি একটি হেরিটেজ। প্রায় ৫ বছর আগে একবার এটি ভাঙ্গার কথা হয়েছিল। কিছু অংশ ভেঙ্গেও ফেলা হয়, সেসময় সরকার পুরো এলাকাকে হেরিটেজ ঘোষণা করায় তা বন্ধ হয়ে যায়। গত কয়েকদিন ধরে আবারও এ ভবনটি ভাঙ্গার একটি চক্রান্ত হচ্ছে যার সঙ্গে একজন সরকার সমর্থক নেতা জড়িত। ভবনের বাসিন্দাদের ইতিমধ্যে ভয়ভীতি দেখিয়ে বের করে দেয়া হয়েছে। এখন পুরোহিত সহ দুটি পরিবার রয়েছে। তাদেরকেও ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে। ওই প্রবীণের কাছে জানা যায়, জানকী  দবী নামে একজন ১৯৩০ থেকে ১৯৩২ সালের দিকে এ ভবনটি মন্দিরের নামে উইল করে যান। পরে ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময় জানকী দেবীর পুরো পরিবার ভারতে চলে যায়। তার পরিবারের কেউই এখানে থাকে না। জানকী দেবীর উইল অনুসারে এটি মন্দিরের সম্পত্তি। এটি সংস্কার করা যাবে, তবে ভাঙা যাবে না। শাঁখারি বাজারের পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি অজয় কুমান নন্দী বলেন, আমরা যতদূর জানি যারা ডেভেলপার তারা রাজউকের অনুমতি নিয়ে সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণ করতে চাইছে। রাজউক কোন ভবন ভাঙার অনুমতি দিয়েছে কিনা জানতে চাইলে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শফিউল হান্নান বলেন, না, এ ধরনের কোন অনুমতি রাজউক দেয়নি। শাঁখারি বাজার পুরো এলাকাটি হেরিটেজ ঘোষণা করা হয়েছে। আইন অনুসারে এ এলাকার কোন ভবন ভাঙা যাবে না। তবে রাজউকের অনুমতি নিয়ে মূল নকশা ঠিক রেখে সংস্কার করা যাবে। কোন ভবন ভাঙা হলে সেটি শাস্তিমূলক অপরাধ বলে জানান তিনি। ভবনটি ভাঙার একটি পরিকল্পনা করা হচ্ছে এটি শোনার পরে আমি লোক পাঠিয়েছিলাম কিন্তু তেমন কিছু চোখে পড়েনি। এ ভবনগুলো এমনিতেই অনেক ঝুঁকিপূর্ণ। তারপরও যেহতু সরকার এগুলোকে হেরিটেজ ঘোষণা করেছে আমরা আমাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করছি যেন কোন ভবন ভাঙা না হয়। ঢাকা মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি দেবাশীষ বিশ্বাস নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, এটা কোন দেবোত্তর সম্পত্তি না। বিশ্বজিত দত্ত ভুলুর পারিবারিক সম্পত্তি সেটি তার পরিবার ডেভেলপারকে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে শুনেছি। এখানে অন্য কারও আপত্তি থাকার কথা না। আমার বিরুদ্ধে এ অভিযোগ সত্যি না। আমি কেন এগুলো করতে যাবো। শাঁখারি বাজার এলাকা হেরিটেজভুক্ত হওয়ার ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ভাই আমরা তো সমাজ নিয়ে চলি, সমাজের সকলে মিলে যে সিদ্ধান্ত নেয় তা পালনের চেষ্টা করি। আমরা এ এলাকায় কষ্টে মানবেতর জীবন যাপন করি, আমাদের সংসদ সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ আশ্বস্ত করেছেন সংস্কৃতি মন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করবেন। ১৪ নম্বর ভবনটিকে রক্ষা করতে বৃহস্পতিবার গৃহায়ণ মন্ত্রণালয়, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, রাজউক, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, ঢাকা জেলা প্রসাশক এবং পুলিশ কমিশনারকে একটি লিগ্যাল নোটিশ দিয়েছে আরবান স্টাডি গ্রুপ (ইউএসজি) নামে একটি বেসরকারি সংস্থা। ইউএসজি এর প্রধান নির্বাহী তৈমুর আহমেদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আমরা সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে আসছি তারা যেন এ এলাকাটিকে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়। প্রত্নতত্ত্ব এবং স্থাপত্য বিষয়ে এলাকাটির একটি আলাদা গুরুত্ব রয়েছে, এ জন্যই এটিকে সংরক্ষণ করা উচিত। আমরা সরকারকে বলেছিলাম যেন লাইভলিহুড বজায় রেখে এ অঞ্চলে সংস্কার চালানো হয়। কিন্তু সরকারের দীর্ঘসূত্রতায় অনেক জটিলতার সৃষ্টি হচ্ছে। রাজধানী ঢাকার প্রায় ৪শ’ বছরের পুরনো এ এলাকার নামটি এসেছে শাঁখারিদের পেশা থেকে। শাঁখারিরা বংশগতভাবে শাঁখা তৈরির কাজে নিয়োজিত। শাঁখা, সিঁদুর থেকে শুরু করে পূজার যে কোন সামগ্রী পাওয়া যায় এ বাজারে। বর্তমানে প্রায় ২০ হাজার হিন্দু বসবাস করছেন শাঁখারি বাজারে।

 

http://mzamin.com/details.php?mzamin=MzA4MTY%3D&s=Mw%3D%3D#.U7WrBV681cY.facebook

Advertisements
This entry was posted in in Bangla, News. Bookmark the permalink.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

w

Connecting to %s